কোন একটি প্রতিষ্ঠান আবেদনের জন্য পাঠানো সিভিতে আপনার কাজের অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অন্যান্য দক্ষতার উল্লেখ থাকে। তবে সে পদের জন্য আপনি কেন যোগ্য, সিভিতে কিন্তু তার ব্যাখ্যা থাকে না। আমাদের অনেকেরই ধারণা থাকে যে, সিভির সাথে পাঠানো কভার লেটারটি পড়ে দেখা হয় না। কিন্তু এটা একদম ভুল ধারণা। কোথাও চাকরি পেতে হলে আপনার সিভি যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি এই লেটারটি ও গুরুত্বপূর্ণ। একটি সুন্দর, ছোট এবং মার্জিত কভার লেটার চাকরি পেতে ৯০% পর্যন্ত সহায়তা করতে পারে। নিয়োগকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চমৎকার এই লেটার লেখার জন্য কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হয়। এই আর্টিকেলটি পড়লে কভার লেটার কি? কেন প্রয়োজন? কিংবা এই লেটার কিভাবে লিখতে হয়? মনের মধ্যে এমন জিজ্ঞাসা থাকলে আশা করি আপনার সমস্ত জিজ্ঞাসার উত্তর পেয়ে যাবেন। এই লেটারের অনেক সমার্থক শব্দ আছে যেমন সাইড লেটার, কলিং লেটার। চলুন তাহলে দেখে নেই কভার লেটার কিভাবে লিখবেন?

কভার লেটার কি?

কভার লেটার বা কলিং লেটার এর মাধ্যমে খুব সংক্ষেপে তুলে ধরা হয় আবেদনকারীর সুনির্দিষ্ট কোন পদের জন্য সে কেন যোগ্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই লেটার মূলত সম্পূর্ণ সিভির সারসংক্ষেপ।এই লেটার পড়ার মাধ্যমে নিয়োগকর্তা আবেদনকারীর সব যোগ্যতা এক দৃষ্টিতে দেখতে পারেন, যা আবেদনকারীর সম্পর্কে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে তাকে উৎসাহিত করে।

কেন প্রয়োজন?

আপনাকে মনোনীত করার জন্য আপনার সিভিটি ভালোভাবে পর্যালোচনা করা হয়। কিন্তু সিভি পর্যালোচনার পর নিয়োগকর্তা সিদ্ধান্ত নিতে কিছু সেকেন্ড সময় নিয়ে থাকেন। এই কম সময়ের মধ্যে তিনি আপনার সম্পূর্ণ সিভি মস্তিষ্ক দিয়ে স্ক্যান করেন এবং আকর্ষণীয় কিছু খোঁজেন আপনার সম্পর্কে, যার উপর ভিত্তি করে তিনি আপনাকে নির্বাচন করবেন। আরো কিছু বিষয় আছে। যেমন-

সিভিতে কভার লেটার গৌণ বিষয় হলেও শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্তের জন্য এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আকর্ষণীয় সিভি তৈরীর জন্য এই লেটার লেখার দিকে সবচেয়ে বেশি সময় দিন।
কলিং লেটার আপনার ভাগ্য আমন্ত্রণে অনেকাংশে দায়ী।
একটি আকর্ষণীয় কভার লেটার আপনাকে অন্যান্য প্রার্থীর চেয়ে এগিয়ে রাখবে।

কিভাবে লিখবেন?

বেশি কিছু না, কিছু নিয়ম ফলো করলেই আপনার সিভি হয়ে উঠবে স্মার্ট এবং আকর্ষণীয়। নিচে সেগুলো দেয়া হলঃ

ভাষাঃ কভার লেটার ইংরেজি ভাষায় লিখতে হয়। তাই আকর্ষণীয় ভাবে লিখতে হলে ইংরেজি ভাষার উপর দখল থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

অংশবিশেষঃ একটি কভার লেটার এর মূলত তিনটি অংশ থাকে। প্রথম অংশে থাকবে – আপনি কোন পদের জন্য আবেদন করেছেন? কিভাবে এ নিয়োগ সম্পর্কে জানলেন? আপনি কেন এই পদে কাজ করার জন্য আগ্রহী? মূল অংশ থাকবে – যে পদের জন্য আপনি আবেদন করেছেন তার সাথে আপনার যোগ্যতা কিভাবে সম্পর্কিত, তা ব্যাখ্যা করুন। আপনার আগের কাজের অভিজ্ঞতাগুলো কিভাবে বর্তমান পদ ও প্রতিষ্ঠানের কাজে আসবে তা পরিষ্কারভাবে লিখুন। আর শেষ অংশে – ইন্টারভিউর জন্য আপনার আগ্রহের কথা জানান। কিভাবে আপনার সাথে নিয়োগকর্তারা যোগাযোগ করবে, তা উল্লেখ করুন।

সহজ শব্দের ব্যবহারঃ শব্দ বাহুল্য এবং ঝরঝরে গদ্যের ধরণে সিভি বা কভার লেটার লেখার জন্য প্রযোজ্য নয়। আপনার শব্দ ভান্ডার কতটা সমৃদ্ধ এবং আপনি মনের ভাব কি রকম শব্দ ব্যবহার করে প্রকাশ করতে পারেন তা প্রদর্শনের জায়গা সিভি বা কলিংলেটার নয়। উচ্চমানের শব্দ ব্যবহার এবং কথার বাহুল্য আপনার দাম্ভিকতা প্রকাশ করে যা আপনার চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা কে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত করে। যেমন- এই লেটার লিখতে গিয়ে কোথাও ইউটিলাইজ শব্দটি ব্যবহার করবেন না। কারণ এরকম শব্দে আপনার দাম্ভিকতা প্রকাশ পায়। এর পরিবর্তে আপনি ইউজ শব্দটি ব্যবহার করুন। তাহলে বুঝতেই পারছেন সিভি এবং কলিং লেটার লেখার সময় শব্দ চয়ন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কেমন শব্দ ব্যবহার করছেন তার উপর ভিত্তি করে নিয়োগকর্তা আপনার দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যায়ন করে থাকেন। যেহেতু আপনি চাকরি প্রার্থী তাই দাম্ভিকতা প্রকাশ করার কোন দরকার নেই। সুতরাং এটি লেখার সময় সহজ শব্দ ব্যবহার করে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করুন আর এমন শব্দ ব্যবহার করুন যার মধ্য দিয়ে আপনার বিনয়ী, নম্রতা এবং প্রার্থিতা ভাব প্রকাশ পায়।

লেটারের ফরমেটঃ এই চিঠি লেখার ফরমেট কি হবে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবসময় চেষ্টা করুন সহজ ফরমেট ব্যবহার করার। টাইম নিউ রোমান ফরমেটের অক্ষর সাইজ ১২ তাই অন্যান্য সব ফরমেট এর চেয়ে অধিক গ্রহণযোগ্য। সরকারি-বেসরকারি দফতরগুলোতে এটি বহুল ব্যবহৃত ফরমেট। তাছাড়া দুটি লাইনের মাঝে স্পেস কখনো বেশি রাখবেন না, আবার কাছাকাছি ও রাখবেন না যেন পড়তে অসুবিধা হয়।

সঠিক নিয়ম অনুসরণ করাঃ বেশিরভাগ আবেদনকারী ইন্টারভিউ পর্যায় পর্যন্ত যেতে ব্যর্থ হয় শুধু মনোযোগের অভাবে কারণ তারা সিভি এবং এই লেটার মনোযোগ দিয়ে প্রস্তুত করে না। কেননা এই মনোযোগ এর অভাবে বেশিরভাগ আবেদনকারী আবেদনের পর কোম্পানির পক্ষ থেকে কোন ফোন কল পায় না। নিয়োগকর্তারা কোন সিভির কভার লেটার পিডিএফ ফরমেট বা ইমেইলের বডিতে পেলে আবেদনকারীকে বাদ দেওয়ার আগে আবেদনকারীর কম্পিউটার সেন্স নিয়ে মনে মনে প্রশ্ন তোলেন। তাই এই লেটার লেখার সময় সঠিক নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।

প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করাঃ আপনার লেটারটি প্রাসঙ্গিক হওয়া বাঞ্ছনীয়। আপনি এমন কোনো অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করুন যেটা যে পদে আবেদন করেছেন সেটার সাথে সম্পর্কিত। প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করুন।

সিভিতে লেখা বিষয়গুলোর পুনরাবৃত্তি করাঃ এই লেটারে সে বিষয়গুলো তুলে ধরুন যা আপনার সিভিতে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয় নি। একেবারে নতুন তথ্য প্রদান করা থেকে বিরত থাকুন।

পর্যাপ্ত গবেষণা করাঃ আপনি যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি প্রার্থী সেই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য আপনার জানা উচিত। না জেনে কোন তথ্য এই লেটারে লিখলে সেটি আপনার উদাসীনতার পরিচয় দিবে।

মিথ্যা তথ্য প্রদান না করাঃ কোনভাবেই মিথ্যা তথ্য প্রদান করা যাবে না। যদি কোন বিষয়ে আপনি পারদর্শী না হয়েও সেটি সম্পর্কে আপনার লেটারে উল্লেখ করেন এবং পরবর্তীতে সেটি অসত্য বলে প্রমাণিত হলে মোটেও আপনার জন্য মঙ্গলজনক হবে না। তাই মিথ্যা তথ্য প্রদান করা থেকে সবসময় বিরত থাকুন।

সংক্ষিপ্ত রাখাঃ এটি লিখতে গিয়ে রচনা লিখে ফেলা যাবে না। যিনি আপনার লেটারটি পড়বেন তিনি যেন সেটি পড়তে পড়তে বিরক্ত না হন সে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। বেশিরভাগ কভার লেটার বড় হলে নিয়োগকর্তারা সেটি পড়তে চান না।

অসম্পূর্ণ না রাখাঃ এই লেটার এর শেষে যদি আপনি আপনার নাম বা সংক্ষিপ্ত পরিচয় উল্লেখ না করেন তাহলে সেটি অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। আর অসম্পূর্ণ আবেদন পড়তে ভালো লাগবে না। তাই আপনার এই লেটার এর শেষ লাইনের নিচে আপনার নাম এবং সংক্ষিপ্ত পরিচয় লিখতে ভুলবেন না।

আশা করি, এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনারা যারা চাকরিপ্রার্থী আছেন তারা সিভির সাথে কভার লেটারটি আরো সতর্কতার সাথে লিখবেন। সবশেষে, এই লেটারের খুঁটিনাটি বিষয়ের দিকে নজর রাখবেন। সিভি এবং এই লেটার লেখার সময় চাকরিদাতার চোখ দিয়ে সবকিছু মূল্যায়ন করার চেষ্টা করুন। আকর্ষণীয় কভার লেটার লিখে আকর্ষণীয় পদের জন্য নির্বাচন হন এই কামনায় আজকের মত শেষ করছি। সবার জন্য রইল শুভকামনা।