career-as-graphic-designer

গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়াবেন কিভাবে?

জীবনের আনন্দ বা কাজের মাঝে যে তৃপ্তি থাকে তা যারা সারা জীবন টাকার পিছনে ছোটে তারা বুঝতেই পারবে না। কোন কিছু সৃষ্টির মাঝে যে কি আনন্দ! শুধু টাকার পিছনে ছোটা মানুষের কাছে সেগুলো অধরাই থেকে যায়। যাইহোক উপরের ক্যাপশন দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন আজকের আর্টিকেলটি কি নিয়ে লেখা হয়েছে। হা, আজকের আর্টিকেলটি গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়াবেন কিভাবে? এ প্রসঙ্গে লেখা। যারা পেশা নির্বাচনের জন্য  একটু অন্যরকম ভাবে চিন্তা করেন তারা এমন কোন পেশায় নিজেকে যুক্ত করতে চায় যেখানে শুধু অর্থ নয় সেই সাথে থাকবে পেশাগত চ্যালেঞ্জ উপভোগ করার সুযোগ। তেমনি একটি সৃজনশীল সেক্টর হচ্ছে গ্রাফিক্স ডিজাইন। যারা সৃজনশীল কাজ পছন্দ করেন তারা ভবিষ্যত পেশা হিসেবে নিজের শখের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে পেশা নির্বাচন করে। গ্রাফিক্স ডিজাইন হচ্ছে একটি সৃজনশীল পেশা যা কিনা আপনি ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিতে পারেন। আজকের লেখাটি পড়লে আপনাদের যাদের ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন ইচ্ছা রয়েছে গ্রাফিক্স ডিজাইনের উপরে তারা পড়ে বেশ উপকৃত হতে পারবেন বলে আশা করছি। চলুন কথা না বাড়িয়ে গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসাবে ক্যারিয়ার গড়ার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জেনে নিই। 

গ্রাফিক্স ডিজাইন কি?

গ্রাফিক্স ডিজাইন হল এমন একটি উপস্থাপনা যার মাধ্যমে যে কোন তথ্য বা ছবি শৈল্পিক উপায়ে উপস্থাপন করা হয়। একজন গ্রাফিক্স ডিজাইনার খুব সহজে এবং নান্দনিক উপায়ে তথ্য পৌঁছে দিতে পারে মানুষের মাঝে। বর্তমানে গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজের ধারার অনেক পরিবর্তন এসেছে সেই সাথে কাজ সহজ করার জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন প্রযুক্তি এবং সফটওয়্যার। 

গ্রাফিক্স ডিজাইনারের পড়াশোনাঃ

গ্রাফিক্স ডিজাইনার হতে হলে যেকোনো ইনস্টিটিউট থেকে পড়াশোনা করতে হবে তেমন নয়। ইংরেজিতে দক্ষ হলেই অনেক ভালো করা সম্ভব। অনলাইনে ঘাটাঘাটি বা বিদেশী ক্লায়েন্টের সাথে যোগাযোগের জন্য ইংরেজি জানা অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি  বিষয়। এছাড়া বেসিক কম্পিউটার সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। ডিজাইনের কাজের জন্য অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন হলো ইমেজ এডিটিং সফটওয়্যার। যেমন- এডোবি ফটোশপ, এডোবি ইলাস্ট্রেটর ইত্যাদি।  

গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসাবে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য কিছু বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। যেমন – 

  1. অভিজ্ঞ কোনো ব্যক্তি কিংবা  অভিজ্ঞ কোন প্রতিষ্ঠান হতে গ্রাফিক্স প্রশিক্ষণ নিতে হবে।
  2.  কাজের  মানের উন্নতির দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  3. নিজের ডিজাইনের কারসহ ভালো মানের  পোর্টফোলিও তৈরি।
  4. ডিজাইনার হিসেবে নিজের পরিচিতি( ব্র্যান্ড) তৈরি করতে হবে।

কাজের মানের উন্নতির দিকে খেয়ালঃ

গ্রাফিক্সের কাজে ক্রিয়েটিভিটি সবচাইতে বড় বিষয়। খুব কম মানুষই আছে যারা জন্মগতভাবে অনেক ক্রিয়েটিভ। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষকেই সাধনা করে ডিজাইন সেন্স বৃদ্ধি করতে হয়। ক্রিয়েটিভিটি বাড়াতে হলে কোন প্রজেক্টে কাজ করতে হবে এবং সেই সাথে প্রজেক্ট রিলেটেড ডিজাইন দেখে সেগুলো থেকে ভালো কনসেপ্ট তৈরি করে ডিজাইন সম্পূর্ণ করলে কনসেপ্ট যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি ক্রিয়েটিভিটি ও বাড়বে। এছাড়া আরও একটি উপায় হল ডিজাইন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আয় সম্পর্কিত মার্কেটপ্লেসগুলোতে কাজ করা যেতে পারে। 99designs.com, freelancer.com/contest/ এরকম দুটি মার্কেটপ্লেস। এ ধরনের মার্কেটপ্লেসগুলোতে কাজের সুবিধা হচ্ছে, নতুন হোক কিংবা পুরাতন যে কেউ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারে এবং সবারই জেতার সম্ভাবনা থাকে। আবার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী অন্যদের ডিজাইন ও দেখার সুযোগ থাকে। এতে ভালো কনসেপ্ট তৈরি হয়। যদি এখানে কোন ডিজাইনে জেতা যায় তাহলে অন্য যেকোনো মার্কেটপ্লেসগুলো থেকে বেশি আয় করা যায়। যেমন, ওডেস্কে একটি লোগো ডিজাইনের কাজ করলে আয় করা যায় ২৫ থেকে ৫০ ডলার কিন্তু 99designs.com এ একটি লোগো ডিজাইন প্রতিযোগিতাতে জিতলে পাওয়া যায় ৩০০ ডলার। ডিজাইন কনসেপ্ট তৈরীর জন্য পিএইচডি টেমপ্লেট ডিজাইন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলে সবচেয়ে ভালো উপকৃত হতে পারবেন। কমপক্ষে ১৫ টা প্রতিযোগিতাতে অংশগ্রহণের পর নিজেকে ডিজাইনার হিসাবে আবিষ্কার করতে পারবেন। মনে রাখা প্রয়োজন যে, টুলস এর ব্যবহার জানলেই ডিজাইনার হওয়া যায় না। ডিজাইনার হতে হলে অবশ্যই সাধনা করতে হবে। 

ভালো মানের পোর্টফোলিও তৈরিঃ

ক্রিটিভিটি তৈরি এবং পোর্টফোলিও তৈরীর কাজ একই সাথে করা যাবে। ভালো মানের পোর্টফোলিও তৈরীর জন্য কাজ করতে হবে Graphicriver.net এ। এ সাইটটি আপনার পোর্টফোলিও হিসাবে বিভিন্ন জায়গাতে গ্রাফিক্সের কাজ পেতে সাহায্য করবে। এখানে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডের ডিজাইন তৈরি করে সাবমিট করতে হয়। যদি এডমিন আপনার ডিজাইনটি অ্যাপ্রুভ করে তাহলে সেই সাইট হতে যতবার আপনার ডিজাইন বিক্রি হবে ততবার আপনার আয় হবে। বিক্রি বৃদ্ধির জন্য সোশ্যাল মিডিয়া সাইটগুলোতে ক্যাম্পেইন চালাতে পারবেন। এ সাইটটি আপনাকে ভবিষ্যতের গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসাবে চাকুরী ওডেস্ক- ইল্যান্স মার্কেটপ্লেসগুলোতে বিড করে এবং পিপল পার আওয়ার, ফাইবারে কাজ পেতে সাহায্য করবে। সেই সাথে মার্কেটপ্লেসগুলোর থেকে বাহিরে সরাসরি কাজ পেতেও এটি পোর্টফোলিও হিসেবে কাজ করবে। আবার, ডিজাইনার নির্ভর নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোতে খুব ভালোভাবে অ্যাক্টিভ থাকতে হবে। এ ধরনের সাইট গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত দুটি সাইটের নাম হচ্ছে বিহেন্স এবং ড্রিবল। এ দুটি সাইট হল মার্কেটপ্লেস বা চাকুরি সার্চ এর ক্ষেত্র।

ইন্টারনেটে টিউটোরিয়াল দেখে শেখাঃ

ইন্টারনেট এ টিডটোরিয়াল দেখেও গ্রাফিক্স ডিজাইন শেখা সম্ভব। আপনি গ্রাফিক্স ডিজাইন টিউটোরিয়াল লিখে গুগলে সার্চ করলেই দেখতে পাবেন কত টিডটোরিয়াল। অনেকগুলোর আবার সিরিয়াল টিডটোরিয়াল আছে যা দেখে আপনি প্রাকটিস করতে পারবেন। ভিডিও টিডটোরিয়াল দেখে শেখার জন্য আপনাকে একটু স্মার্টলি গুগল সার্চ করা শিখতে হবে। এটা একদিনেই সম্ভব নয়। কাজে লেগে থাকলেই সম্ভব হবে।

ক্যারিয়ার বা পেশা হিসেবে গ্রাফিক্স ডিজাইনঃ

একজন দক্ষ গ্রাফিক্স ডিজাইনারের চাহিদা ব্যাপক। বর্তমানে গ্রাফিক্স ডিজাইন সেক্টরটি শুধু চাকুরির উপর নির্ভর করে না, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা আউটসোসিং করেও প্রতি মাসে ভাল টাকা আয় করা সম্ভব। অনলাইন এবং অফলাইন দুটো জায়গাতেই এর চাহিদা ব্যাপক। যে কোন ভাল কোম্পানিতে আপনি ভাল স্যালারিতে যোগদান করতে পারেন, তবে অবশ্যই আপনাকে আপনার দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। সর্বোপরি, বর্তমান বিশ্বে গ্রাফিক্স ডিজাইনের ক্ষেত্র অনেক বিশাল যা কিনা এখন প্রায় প্রতিটি সেক্টরেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দরকার হয়। আপনি আপনার সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে সাফল্যর শিখরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখলে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিতে পারেন এই বিশাল সম্ভাবনাময় পেশা গ্রাফিক্স ডিজাইনকে। 

ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসগুলোতে গ্রাফিক্স ডিজাইনের পরিধিঃ

এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ফ্রীল্যান্স মার্কেটপ্লেসগুলোতে মোট কাজের ১৪ % হল গ্রাফিক্স এবং মাল্টিমিডিয়ার কাজ যা গত বছরে বৃদ্ধি পেয়ে ৪৪% পর্যন্ত হয়েছিল। ২০১২ থেকে ২০১৩  সাল পর্যন্ত শুধুমাত্র ইল্যান্সেই গ্রাফিক্স রিলেটেড জব পোস্ট হয়েছিল ৯ লাখ ১৩ হাজারের ও উপরে, এর পিছনে ব্যয় হয়েছে ৫ শত ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাই ফ্রিল্যান্সার হতে যাওয়া তরুণ-তরুণীদের পছন্দের কাজের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে এ পেশাটি। 

কোন ধরনের কাজে গ্রাফিক্স ডিজাইন প্রয়োজনঃ

একটু চোখ বুলালেই আমাদের আশেপাশে কৃত্তিম যা কিছু আছে তার সবটাতেই গ্রাফিক্সের ছোঁয়া  রয়েছে। এই সেক্টরের বিস্তৃতি অনেক বিশাল শেষ করা যাবে না। কিছু কিছু কাজের জায়গা গুলো একটু জানিয়ে দেই। যেমন,

  • ফ্যাশন ডিজাইন
  • টেক্সটাইল ডিজাইন
  • ইন্টেরিয়র ডিজাইন
  • অ্যাড মেকিং
  • ব্র্যান্ডিং
  • প্রমোশন
  • লোগো
  • কার্টুন মেকিং
  • ইন্টারেক্টিভ মিডিয়া
  • টিভি মিডিয়া
  • প্রিন্ট মিডিয়া
  • ওয়েব মিডিয়া
  • ফটোগ্রাফি
  • গেম ডিজাইন
  • ফাইন আর্ট
  • ইনফরমেশন মিডিয়া
  • মোবাইল অ্যাপ ডিজাইন

এছাড়াও আরো অসংখ্য সেক্টরে এর কাজের ছড়াছড়ি। গ্রাফিক্স ডিজাইনাররা তাদের কাজের জন্য বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করে থাকে।

গ্রাফিক্স ডিজাইনের জন্য ব্যবহৃত সফটওয়্যারঃ

গ্রাফিক্স ডিজাইন অনেক জনপ্রিয় হয়ে ওঠার মূল কারণ হলো এর মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং করে প্রতি মাসে প্রচুর ইনকাম জেনারেট করা যায়। গ্রাফিক্স ডিজাইনের জন্য অনেক সফটওয়্যার আছে। যেমন –

  • Adobe In Design
  • Quarkxpress
  • Lucidpress
  • Microsoft Publisher
  • Adobe Photoshop
  • GIMP
  • Canva
  • PicMonkey
  • Adobe Illustrator
  • Corel Draw
  • Gravit Designer
  • Inkscape

এগুলো ছাড়াও আরো অনেক সফটওয়্যার আছে তবে কাজের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন সফটওয়্যার প্রয়োজন হয়ে থাকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল দক্ষ গ্রাফিক্স ডিজাইনার হতে হলে বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। যত বেশি সফটওয়্যার জানা থাকবে কাজের পরিধি ও তত বেশি বাড়ানো সম্ভব। সেই সঙ্গে উপার্জন তো আছেই!

সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও এখন গ্রাফিক্স ডিজাইন বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়টি। তবে গ্রাফিক্স ডিজাইনে ক্যারিয়ার গড়া কিংবা ফ্রিল্যান্সিং পেশা হতে পারে নিজেদের স্বাবলম্বী করার একটি ভালো সুযোগ। আগেই বলেছি ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসগুলোতে গ্রাফিক্স ডিজাইনের চাহিদা ব্যাপক। তাই সময় নষ্ট না করে গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার চেষ্টা আরম্ভ করুন যদি আপনি বা আপনারা এই পেশাকে পছন্দ করে থাকেন। একজন সফল গ্রাফিক্স ডিজাইনার হওয়ার জন্য রইল অগ্রিম শুভেচ্ছা।