এই পৃথিবীতে যতগুলো পেশা আছে সব থেকে মূল্যবান পেশা হলো ডাক্তার পেশা। কারণ আপনি আমি সবাই জানি একজন ডাক্তারের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে সেবা দেওয়া। এই সেবার মাধ্যমেই মানুষের কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব হয়। আর বিশ্বাসের কথা নাই বা বলা হল, একজন মানুষ নিজের থেকেও বিশ্বাস করে ডাক্তারকে। তাই এ পেশাটি হলো পৃথিবীর সবচেয়ে দামি পেশা, মানুষের বিশ্বাস, মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার পেশা। আজকের আর্টিকেলে এই দামি পেশার কারিগর তৈরীর কারখানা নিয়ে কথা বলব, মানে বাংলাদেশের সেরা মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে কথা বলবো। যেখানে শিক্ষার্থীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে পড়াশোনা করে ডাক্তার হওয়ার জন্য, মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্য। বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোটামুটি চিকিৎসাশাস্ত্রের বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্বমানের পাঠদান করা হয়ে থাকে তাই প্রতিবেশী দেশসহ সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশগুলোর শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনার জন্য আসে। তাই বলা যায় বাংলাদেশের যতগুলো মেডিকেল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে তার সবগুলোই দক্ষ ও যোগ্য চিকিৎসক তৈরিতে যার যার অবস্থান রেখে চলছে। তাহলে চলুন বাংলাদেশের সেরা মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলো সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।

ঢাকা মেডিকেল কলেজঃ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ঢাকায় অবস্থিত একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ।এটি ১৯৪৬ সালে ঢাকার বকশিবাজারে প্রতিষ্ঠিত হয়। ৫ বছর মেয়াদী এমবিবিএস কোর্স রয়েছে, এখানে প্রতিবছর ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় সবার উপরে থাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ এর অবস্থান।বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজে বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে যেমন-কলেজ ভবন,অডিটোরিয়া্‌ম, পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্র, ছাত্র ছাত্রীদের জন্য হোস্টেল, বার্ন ইউনিট ইত্যাদি। বর্তমানে এখানে বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতকোত্তর কোর্স চালু করা হয়েছে।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজঃ

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ বাংলাদেশের একটি অন্যতম মেডিকেল কলেজ। এটি ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ মেডিকাল কলেজটি মিটফোর্ড হাসপাতাল নামে ও পরিচিত। ১৯৬২ সালে মিটফোর্ড কলেজ এবং ১৯৬৩ সালে তৎকালীন নওয়াব সলিমুল্লাহর নামে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ নামকরণ করা হয়। ১৯৭৩ সাল থেকে এখানে এমবিবিএস ডিগ্রির জন্য ছাত্ররা ভর্তি হতে শুরু করে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজঃ

ময়মনসিংহ শহরে অবস্থিত আরো একটি স্বনামধন্য চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ। এটি একটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তবে প্রশাসনিকভাবে এ মেডিকেল কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাশাস্ত্রের নিয়ন্ত্রণাধীন। ১৯২৪ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে বাংলার তৎকালীন গভর্নরের নামে লিটন মেডিকেল স্কুল হিসেবে চালু হয়। পরে ১৯৬২ সালে একে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ এ উন্নীত করা হয়। উন্নত শিক্ষার পাশাপাশি মানসম্মত চিকিৎসা সেবা প্রদান করে থাকে। এখানে আরও রয়েছে ছাত্র ছাত্রীদের জন্য হোস্টেল, পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্র, কলেজ ভবন ইত্যাদি।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজঃ

বাংলাদেশের সেরা মেডিকেল কলেজগুলোর তালিকায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ তার শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে অনেক আগে থেকেই। এটি ২০০৬ সাল থেকে তার শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রথম দিকে এটি বেগম খালেদা জিয়া মেডিকেল কলেজ নামে পরিচিত ছিল পরে ২০০৯ সালে এটি নাম পরিবর্তন করে হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ। এর অবস্থান ঢাকা শেরেবাংলা নগরে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ঃ

চট্টগ্রামে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও উন্নত চিকিৎসার জন্য গড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। এটি ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে দেশের অন্যতম প্রধান চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে প্রতিবছর এমবিবিএস ও বিডিএস কোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে থাকে। এছাড়া বর্তমানে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এমডি ,এম এস, এমফিল, ডিপ্লোমা, এমপিএইচ ডিগ্রি চালু রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, ইরা্‌ন, মালয়েশিয়া, নেপা্‌ল, প্যালেস্টাইন,পাকিস্তান এবং শ্রীলংকার শিক্ষার্থীরাও এমবিবিএস কোর্সে পড়াশোনা করতে আসে।

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ঃ

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। এই মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়টি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে কোর্স পরিচালনা করে। এটি রাজশাহী অঞ্চলের তথা গোটা উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিন যাবৎ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত করে আসছে। এতে রয়েছে সুবিশাল ক্যাম্পাস, অডিটোরিয়া্‌ম, ছাত্র ছাত্রীদের জন্য আবাসিক হল, পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্র ইত্যাদি।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজঃ

কুমিল্লা অঞ্চলের মানুষকে চিকিৎসা সেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে ১৯৭৯ সালে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কুমিল্লা মেডিকেল স্থাপন করেন। এটি কুমিল্লার কুচাইতলি গ্রামে অবস্থিত। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে রয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা যেমন কলেজ ভবন, পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্র, অডিটোরিয়া্‌ম, ছাত্র-ছাত্রীদের হোস্টেল ইত্যাদি। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এটি বেশ সুনাম কুড়িয়ে যাচ্ছে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এটি দেশের শীর্ষ মেডিকেল কলেজগুলোর মধ্যে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। হাজার হাজার শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশুনার জন্য আবেদন করে তবে মেধার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থীদের এখানে ভর্তি করানো হয়ে থাকে। এছাড়া বিদেশি শিক্ষার্থীরা ও এখানে পড়াশোনা করতে আসে।

সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ঃ

সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের চতুর্থ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। মেডিকেল কলেজগুলোতে চিকিৎসার মান ঠিকমতো পালন করা হচ্ছে কিনা তা কঠোরভাবে মনিটরিং করার জন্য মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই লক্ষ্যেই সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাশাস্ত্রের মানোন্নয়নে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও আধুনিক জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নতুন রোগ ও চিকিৎসা গবেষণার উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজঃ

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ চিকিৎসা বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা দানকারী একটি প্রতিষ্ঠান। এটি ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে ৫ বছর মেয়াদী এমবিবিএস শিক্ষাক্রম চালু রয়েছে যাতে প্রতিবছর ১৯৭ জন শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা হয়ে থাকে এবং ২০১২ সাল থেকে ৪ বছর মেয়াদী ডেন্টাল কোর্স চালু হয়েছে। এখানে মূল শিক্ষাক্রমের পাশাপাশি নার্সদের প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা চালু আছে।

রংপুর মেডিকেল কলেজঃ

রংপুর মেডিকেল কলেজ রংপুর জেলায় অবস্থিত একটি উন্নত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। এটি একটি সরকারি চিকিৎসা দানকারী প্রতিষ্ঠান। এই কলেজটি ১৯৭০ সালে গঠিত হয়। আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোনায়েম খান, পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৬৯ সালে ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট রংপুর মেডিকেল কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রতি বছর বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য ১০টি করে আসন সংরক্ষিত থাকে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ঃ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের প্রথম চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়। এটি পিজি হাসপাতাল নামেই বেশি পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার আগে এর নাম ছিল ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিন এন্ড রিসার্চ। চিকিৎসা শিক্ষায় স্নাতকোত্তর কোর্স প্রদানের জন্য ১৯৬৫ সালে ঢাকায় পিজি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৮ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। উন্নত সেবা, শিক্ষা ও গবেষণার জন্য বেশ প্রশংসিত এ বিশ্ববিদ্যালয়টি।

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজঃ

এটি বাংলাদেশর একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯২ সালে। এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই মেডিকেল কলেজের সাথে সংযুক্ত রয়েছে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল। এখানে উন্নত চিকিৎসা সেবার সুযোগ সুবিধা রয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়।

এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজঃ

এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ এর পূর্ব নাম দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ। এটি ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি মান সম্মত চিকিৎসা সেবা প্রদান করে আসছে নিয়মিতভাবে।

নিচে আরও কয়েকটি সরকারি মেডিকেলের নাম উল্লেখ করা হলো।

খুলনা মেডিকেল কলেজ
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ
পাবনা মেডিকেল কলেজ
আব্দুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজ, নোয়াখালি
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, কক্সবাজার
যশোর মেডিকেল কলেজ
শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ, জামালপুর
শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ, সিরাজগঞ্জ
টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ, টাঙ্গাইল ইত্যাদি

বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলো দেশের জন্য দক্ষ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি এবং বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা প্রদান করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। বর্তমান সরকার প্রতিটি জেলায় মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় তৈরীর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে যা অত্যন্ত সুখকর একটি বিষয়। তাই এই মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় গুলো যেন চিকিৎসা সেবার এক একটি মাইলফলকে রূপান্তরিত হয় সেই কামনা করি এবং এগুলো থেকে যাতে দক্ষ চিকিৎসক বেরিয়ে আসতে পারে এবং মানুষকে উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে সক্ষম হয়।