মার্চেন্ডাইজারের কাজ

মার্চেন্ডাইজার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করবেন যেভাবে

বর্তমানে দেশীয় অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি বড় সম্ভাবনাময় খাত হল পোশাক শিল্প। কেননা দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় অংশটি আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। আর এই পোশাক শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন একজন মার্চেন্ডাইজার। মার্চেন্ডাইজিং পেশা হিসেবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ একজন মার্চেন্ডাইজার কে সবসময় বায়ারদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। শুধু তাই নয় পোশাক তৈরির অর্ডার নেয়া থেকে শুরু করে অর্ডার অনুযায়ী পোশাক সরবরাহ এবং মান নিয়ন্ত্রণের কাজগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাবে করতে হয় একজন মার্চেন্ডাইজারকে। এছাড়া বায়ারদের চাহিদামত পণ্য তৈরি হচ্ছে কিনা তাও দেখতে হয়। বিশ্ববাজারে পোশাকশিল্পের চাহিদার কারণে দেশে এবং বিদেশে এই পেশাটির কদর দিন দিন বেড়েই চলছে। পোশাক শিল্প ও বায়িং হাউজগুলোতে প্রচুর দক্ষ লোক নিয়োগ করা হয়। ফলে পোশাক শিল্পে ক্যারিয়ার গড়তে আপনিও বেছে নিতে পারেন মার্চেন্ডাইজিং পেশা। বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রতিযোগীতামুলক চাকরির বাজারের কথা মাথায় রেখে আপনিও এই পেশাকে আপনার ক্যারিয়ার হিসেবে শুরু করতে পারেন। তাই আজকের আয়োজনে থাকছে মার্চেন্ডাইজার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করবেন যেভাবে সে বিষয়ে কিছু টিপস। আশা করি যারা এ পেশাতে আগ্রহী তাদের উপকারে আসবে।

মার্চেন্ডাইজারের কাজ – মার্চেন্ডাইজার কি কি কাজ করে?

মূলত টেক্সটাইল শিল্পে মার্চেন্ডাইজাররা কাজ করে থাকেন, এনাদের মূলত দুটি কাজ ফ্যাক্টরি এবং বায়িং হাউজ ভিজিট করা। ফ্যাক্টরির চেয়ে বায়িংহাউসে কাজের পরিধি অনেক বড়। মার্চেন্ডাইজাররা বিদেশি বায়ারদের সাথে যোগাযোগ করে পণ্য বিক্রির প্রস্তাব দেন। বায়ার রাজি হলে প্রোডাক্ট এর স্যাম্পল দেখানো হয়। তাছাড়া প্রোডাক্ট এর উপকরণ, প্রোডাক্ট এর মান এবং গুনাগুন এসব বিষয় নিয়েও বায়ারদের সাথে কথা বলতে হয়। বায়ারদের চাহিদা অনুযায়ী ফ্যাক্টরিতে প্রোডাক্ট তৈরি থেকে শুরু করে শিপমেন্ট পর্যন্ত পুরো কাজ দেখতে হয় মার্চেন্ডাইজারদের। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেশের বাহিরে থেকে পণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ইমপোর্ট ও এলসি খোলার কাজও করেন তারা। মার্চেন্ডাইজারদের বায়ারদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা এবং প্রতিনিয়ত কাজের রিপোর্ট ও তৈরি করতে হয়।

মার্চেন্ডাইজার হিসেবে ক্যারিয়ার – মার্চেন্ডাইজার এর যোগ্যতা

মার্চেন্ডাইজার হওয়ার জন্য যে কোন বিষয়ে স্নাতক হলেই চলে। তবে যারা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা অ্যাপারেল মার্চেন্ডাইজিং বা ফ্যাশন ডিজাইনার হিসাবে এমবিএ ডিগ্রী সম্পন্ন করেন তাদের জন্য মার্চেন্ডাইজার পদের চাকরি পাওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।

মার্চেন্ডাইজার হিসেবে ক্যারিয়ার – দক্ষতা ও জ্ঞান

মার্চেন্ডাইজিংকে পেশা হিসেবে নিতে চাইলে কি কি বিষয়ে দক্ষতা ও জ্ঞান থাকা প্রয়োজন সেসব বিষয়গুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে সেগুলো দেওয়া হল

  • একজন মার্চেন্ডাইজারকে ইংরেজি ভাষায় দক্ষ হতে হয়।
  • পোশাক শিল্পের সকল প্রক্রিয়া ও কাঁচামালের দাম সম্পর্কে ধারনা থাকতে হয়।
  • আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট শিপিং, কাস্টম্‌স, বায়িং পলিসি এসব কাজে দক্ষতা থাকতে হয়।
  • বায়ারদের কনভিন্স করার দক্ষতা থাকতে হয়।
  • হিসাব নিকাশ ও পরিকল্পনায় দক্ষ থাকতে হয়।
  • সর্বোপরি পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকতে হবে।

মার্চেন্ডাইজারের কাজের ক্ষেত্র ও সুযোগঃ

বাংলাদেশ প্রতি গার্মেন্টসে ৪-৮ জন করে মার্চেন্ডাইজার এর প্রয়োজন হয়। তাছাড়া একটি বায়িং হাউজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে মার্চেন্ডাইজার তাই একটি বায়িং হাউসে কমপক্ষে ৪ জন করে মার্চেন্ডাইজার কাজ করে। বর্তমানে রেডিমেট গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি এবং বায়িং হাউজের সংখ্যা বাড়ছে ফলে মার্চেন্ডাইজারদের কাজের সুযোগও বাড়ছে।

মার্চেন্ডাইজারের বেতন – মার্চেন্ডাইজারদের মাসিক আয়ঃ

প্রথমেই বলা ভালো যে মার্চেন্ডাইজারের বেতন নির্ভর করে কাজের দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার উপর। শুরুতে একজন মার্চেন্ডাইজার এর মাসিক আয় ১০-২০ হাজার টাকা। সময় যত বাড়তে থাকে অভিজ্ঞতার সাথে বেতনও বাড়তে থাকে। চার থেকে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মার্চেন্ডাইজারের মাসিক আয় হয় ৩০-৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। তারপর সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার বা মার্চেন্ডাইজিং ম্যানেজার দুই লাখ টাকা পর্যন্ত বেতন পেতে পারেন। এক্ষেত্রে একজন মার্চেন্ডাইজারের ইংরেজি দক্ষতা ও যোগাযোগ করার দক্ষতা সেইসঙ্গে শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলা এবং স্মার্টনেস তাকে দ্রুত পদোন্নতিতে সাহায্য করে।

মার্চেন্ডাইজিং বিষয়ে জানতে হবেঃ

একজন মার্চেন্ডাইজারকে ফ্যাশন ও টেক্সটাইল বিষয়ে খুটিনাটি জানতে হয়। এই কোর্সগুলোতে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পেশার সূচনা, ফেব্রি্‌ক, নেটওয়ার্, সোয়েটার ডিজাই্‌ন, টেক্সটাই্‌ল, ফিনিশিং, প্রিন্টিং এন্ড টেস্টিং, মান ব্যবস্থাপনা, প্যাটার্ন মেকিং, উৎপাদন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা, কমার্শিয়াল প্রসিকিউটর, প্রিন্টিং ফ্যাশন, স্টাডিজ প্ল্যানিং, ফেব্রিক ডিজাই্‌ন, কলার মিক্সিং, বিপণন, টেক্সটাইল সাইন্স ইত্যাদি বিষয়ে ব্যবহারিক ও তত্ত্বীয় শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন। এতে করে পেশাগত জীবনটাকে আরো গতিময় করে তুলবে এসব জ্ঞান।

মার্চেন্ডাইজার হিসেবে ক্যারিয়ার যেমন হয়ঃ

শুরুতে অ্যাসিস্ট্যান্ট মার্চেন্ডাইজার হিসেবে নিয়োগ হয়, এরপর যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা বেড়ে গেলে মার্চেন্ডাইজার, সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার এবং মার্চেন্ডাইজার ম্যানেজার হিসেবে পদোন্নতি হয়। বায়ারদের সাথে কথা বলে সহজে কাজ আদায় করা এবং কাজের অগ্রগতির উপর নির্ভর করে পদোন্নতি। তবে মজার বিষয় হচ্ছে নিজের বায়িং হাউস দেয়ার সুযোগ আছে যদি মূলধন এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় দক্ষ হন।

মার্চেন্ডাইজিং কোর্স – ট্রেইনি মার্চেন্ডাইজার – মার্চেন্ডাইজার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে হলে পড়াশোনা যেখানে করবেনঃ

স্নাতক শেষে মার্চেন্ডাইজিং এর উপর কোর্স করা যায়। এর জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৬-১ বছর মেয়াদী কোর্স আছে।কোর্স করতে পারেন এমন কয়টি প্রতিষ্ঠান হল-

  • বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি
  • মার্চেন্ডাইজারস ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন টেকনোলজি
  • বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি
  • ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন টেকনোলজি
  • শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি।

বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজিতে অ্যাপারেল মার্চেন্ডাইজিংয়ে ১ বছর মেয়াদী পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমাও দুই বছর মেয়াদী এমবিএ করার সুযোগ আছে।

সবশেষে, দুই যুগ ধরে পোশাক শিল্প রপ্তানি এবং কর্মসংস্থানের প্রধান ক্ষেত্র হলেও এখন পর্যন্ত এই সেক্টরে অনেক দক্ষ কর্মীর অভাব। অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পোশাকশিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিন দিন বাড়ছে। তাই মার্চেন্ডাইজার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে দেশে অনেক সুযোগ আছে। যে কোন বিষয়ে পড়াশুনা করেও এ পেশায় আসার সুযোগ আছে। মার্চেন্ডাইজার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করতে চান তাহলে এখন থেকে শুরু করে দিন আপনার জোরালো পদক্ষেপ।