ছাত্র জীবন হলো জ্ঞান অর্জনের সময়। ভালো পড়াশোনা ছাড়া আসলে ভালো চাকুরী এই সময়ে এসে পাওয়া প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন ছাত্র বা ছাত্রীর নিজের জীবন চালানো এবং অনেক সময় পরিবারে কন্ট্রিবিউশন করা স্বাভাবিক চিত্র। বেশিরভাগ পরিবারে ছাত্রজীবনেই পরিবারের অর্থনীতির হাল ধরতে হয়। আজকের আর্টিকেলে আলোচনা করব ছাত্র অবস্থায় পার্ট টাইম চাকুরী নাকি টিউশনি  কোনটি করা উচিত এ প্রসঙ্গে। অনেকে টিউশনি কে সবচেয়ে ভাল রাস্তা বলে থাকেন চাকুরী জীবনে প্রবেশ করার জন্য। আবার অনেকে বলে থাকেন পার্ট টাইম চাকুরি হলো সবচেয়ে ভাল রাস্তা চাকুরী জীবনে প্রবেশ করার জন্য। আসলে পার্ট টাইম চাকুরি নাকি টিউশনি এটা নিয়ে দ্বিধায় থাকার দরকার নেই। কারণটা পুরো আর্টিকেল পড়লেই বুঝতে পারবেন। চলুন তাহলে জেনে নেই ছাত্র অবস্থায় পার্টটাইম চাকুরি নাকি টিউশনি কোনটি করা উচিত?

প্রথমেই ছাত্র অবস্থায় পার্টটাইম চাকুরি প্রসঙ্গে আসি, যার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী লেখাপড়ার পাশাপাশি একই সময়ে নিজস্ব ক্যারিয়ার দাঁড় করাতে পারে। যদিও অনেকেই শিক্ষাজীবনে টিউশনি কে সবচেয়ে ভাল বিকল্প মনে করে। তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইদানিং অন্যান্য বিকল্প কাজ জনপ্রিয়তা হতে শুরু করেছে। নতুন সম্ভাবনা হিসেবে তৈরি হচ্ছে আরও কিছু কর্মক্ষেত্র। প্রাইভেট সেক্টরে প্রথম জবের ইন্টারভিউ দিতে গেলে কমন জিজ্ঞাসা থাকে, আপনার কোন অভিজ্ঞতা আছে? কিংবা এ ধরনের কাজ আগে করেছেন? আসলে তারা জানতে চায় যে, আপনার কোন কারিকুলাম এক্টিভিটিজ আছে কি না,আপনার পার্টটাইম জবের অভিজ্ঞতা আছে কিনা ইত্যাদি। মনে রাখা প্রয়োজন ইন্টারভিউ বোর্ডে ফ্রেশারদের জিজ্ঞাসা করা হয় এইরকম কাজ আগে করেছেন কি না? তখন আপনি বলতে পারেন আমিতো নতুন, অভিজ্ঞতা পাব কোথায়?  সত্যি বলতে এই সময় এসে এরকম এক্সকিউজ আর খাটে না কারণ এখন ছোট বড় অনেক কোম্পানিতে শিক্ষার্থীদের পার্টটাইম কাজের অফার দেয়। অনেক শিক্ষার্থী পার্ট টাইম কাজও করে। বিদেশে অনেকেই পিএইচডি করতে গিয়ে রেস্টুরেন্ট বা সুপার শপে কাজ করেন যাতে পড়াশোনার সাথে সাথে নিজের খরচ হয়ে যায়। সচরাচর বিদেশীদের মাঝে দেখা যায় যে, স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও ছুটিতে কোন একটা কাজ টাকা উপার্জন করছে। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের এই ধারণা বিদেশীদের মাঝে স্কুলজীবনেই তৈরি হয়ে যায়। এসবের মাঝেই কিন্তু তাদের লেখাপড়া চলে এবং এতে তাদের লেখাপড়ার কোন বিঘ্ন ঘটে না।

ছাত্রজীবনে কি ধরনের পার্ট টাইম চাকুরী করা উচিত?

যে কোন কোম্পানিতে পার্টটাইম চাকুরী আপনাকে স্বীকৃতি ও সম্মান দেয়। মনে করেন একজন ছাত্র টিউশনি করে অনেক টাকা উপার্জন করছে কিন্তু চাকুরির বাজারে যখন সে গেল তখন দেখল তার অভিজ্ঞতা একদম জিরো। পাশ করার পর যদি টিউশনির থেকেও কম টাকার চাকুরি করে তাহলে তার জন্য টিকে থাকা খুব কঠিন হবে। তাই ছাত্রজীবনে পার্ট টাইম চাকুরি করলে কোন কোম্পানির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসাবে পার্ট টাইম চা্কুরি করা, কোন শপিংমলে সেলসে বা হিসাব নিকাশ রাখার কাজ করা্‌, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এর কা্‌জ, শিক্ষকদের সাথে সহযোগিতামূলক কাজ করা, সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে এমন কাজ করা। মেয়েরা বিভিন্ন কুটির শিল্পের কাজের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারেন। পড়াশোনার পাশাপাশি এ ধরনের কাজের সাথে সম্পৃক্ত হলে তা আপনাকে পরবর্তী চাকুরি জীবনে কি পরিমাণ এগিয়ে নিয়ে যাবে ভাবতেও পারবেন না। তাছাড়া এসব কাজ আপনার সিভিকে করবে অনন্য, আপনাকে চাকুরীর ইন্টারভিউয়ের সময় করে তুলবে আরও আত্মবিশ্বাসী।

ছাত্রজীবনে টিউশনি

ছাত্রজীবনে টুকটাক টিউশনি করেননি এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম নয়। কারো কাছে টিউশনি শুধু শখ, কারো কাছে সময় কাটানো, কারো কাছে পুরনো পড়াশোনা ঝালাই করে নেওয়ার চেষ্টা, আবার কারো কাছে কিছুটা বাড়তি উপার্জন। অন্যকে পড়িয়ে নিজের পড়ালেখার খরচ বহন করেছেন এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম নয়। মাসের শেষে টিউশনির টাকাটা শুধু সম্মানী বহন করেনা বরং বহন করে মেসের ভাড়া, পড়ার খরচ, যাতায়াতের খরচ আর অনেক স্বপ্ন! আজকের দিনে প্রতিষ্ঠিত অনেকেই এরকম টিউশনির উপার্জনে লেখাপড়া করেছেন।

অনেকে মনে করেন আপনি যদি ভাল ক্যারিয়ার গঠন করতে চান, তাহলে টিউশনির উপরে আর কোনো রাস্তা নেই কারণ ছাত্রজীবনেই হলো জ্ঞান অর্জনের মোক্ষম সময়। ছাত্রজীবনে উৎকৃষ্ট জ্ঞান অর্জন হয় টিউশনিতে। পার্ট টাইম চাকুরী করা মানে নিজের সময়কে বিক্রি করে দেয়া।

ছাত্রজীবনে টিউশনির উপকারিতা

আপনি যদি টিউশনি করেন তাহলে আপনি আপনার পড়াশোনার মধ্যে থাকলেন। এখান থেকে আপনি যেমন অর্থ পাবেন তেমনি জ্ঞানও পাবেন। আপনি যদি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সরকারি চাকুরি করতে চান তাহলে টিউশনির উপকারিতা এক কথায় অসাধারণ। কারণ বিসিএসসহ সরকারি ব্যাংক, বীমা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এসব জায়গায় স্কুল-কলেজের পড়াশুনাই বেশি দরকারে আসে। এক্ষেত্রে টিউশনি করালে আপনার স্কুল কলেজের পড়াশোনা যেমন ঝালাই হয়ে যায় তেমনি আপনি প্রতিযোগিতাপরীক্ষায় ও অনেক এগিয়ে থাকলেন।  

ছাত্রজীবনে পার্ট টাইম চাকুরির উপকারিতা

আবার আপনি যদি পার্টটাইম চাকুরি করেন ছাত্র অবস্থায়তাহলে আপনি প্রাইভেট সেক্টরের চাকুরীতে অনেক এগিয়ে থাকবেন। কারণ আমি আগেই বলেছি প্রাইভেট সেক্টরে অভিজ্ঞতা কাজে লাগে। টিউশনির অভিজ্ঞতার সেখানে তেমন কাজ নেই। এছাড়া যদি আপনি উদ্যোক্তা হতে চান তাহলে অবশ্যই পার্ট টাইম চাকুরি আপনাকে পরবর্তীতে অনেক এগিয়ে রাখবে। ব্যবস্থাপনা বিষয়ে, সময়ের সদ্ব্যবহার করা ইত্যাদি নানান কাজে আপনার পার্টটাইম চাকুরির অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে।

ছাত্র অবস্থায় পার্ট টাইম চাকুরী এবং টিউশনির বিকল্প

আমি যেহেতু প্রথমের দিকে বলেছি শিক্ষার্থীদের মাঝে ইদানিং অন্যান্য বিকল্প কর্মসংস্থান জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে, যার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী পড়ালেখা ও করতে পারবে আবার নিজের ক্যারিয়ার কোন দিকে নিয়ে যাবে তার ধারণা ও পেয়ে যাবে। যেমন-  

ফ্রিল্যান্সিংঃ  যেহেতু দেশের ৬৫ শতাংশই তরুণ এবং বেশিরভাগেই বেকার, পর্যাপ্ত চাকুরীর ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না, সেহেতু বর্তমান সময়ে বিকল্প ক্যারিয়ার হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীদের মাঝে।

অনুবাদঃ আপনি যদি বিদেশী ভাষায় দক্ষ হন তাহলে এই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আপনি ঘরে বসেই আয় করতে পারবেন। ইন্টারনেটে অনেকেই পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ভালো অনুবাদক খুঁজে থাকে। 

প্রডাক্ট রিভিউয়ারঃ অনলাইন শপিং দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠায় প্রডাক্ট রিভিউ সাইটগুলোর জনপ্রিয়তাও হু হু করে বাড়ছে। অ্যামাজন কিংবা ই-বের কোন পণ্য কেনার আগে মানুষ এসব প্রডাক্ট রিভিউ দেখে পণ্য কেনে। তাই আপনিও এসব খ্যাতনামা অনলাইন শপিং জায়ান্টের পণ্য রিভিউ লিখে মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করতে পারেন।

ইউটিউব থেকে আয়ঃ  ইউটিউবে নিজের একটি চ্যানেল খুলে মজাদার ও শিক্ষণীয় ভিডিও আপলোড করে আয় করতে পারেন।

লেখালেখিঃ ভাল লেখার হাত এবং ভালো জানাশোনা থাকলে ছাত্র অবস্থায় পার্টটাইম চাকুরি কিংবা টিউশনির দারুন বিকল্প হতে পারে এই বিষয়টি। বিভিন্ন ওয়েবসাইটে পার্ট টাইম কিংবা ফুলটাইম কাজ করে আয় করতে পারেন।

এছাড়াও বিভিন্ন নামকরা রেস্টুরেন্ট, ফ্যাশন হাউসগুলোতে নিয়মিত কর্মী চেয়ে খন্ডকালীন কর্মীর প্রতি বেশি আগ্রহ দেখায়। এসব প্রতিষ্ঠানে নিজের সুবিধা মতো কাজ করতে পারেন।

সবশেষে, এসব কিছু বলার অর্থই হলো আপনি কি করবেন সেটা নির্ভর করছে আপনার উপর। আপনি যে সেক্টরে কাজ করতে চান সেই ভাবে আপনি আপনার ছাত্র জীবন কে কাজে লাগিয়ে পৌছে যেতে পারেন অভিষ্ঠ লক্ষ্যে। তাই আপনার উপরেই নির্ভর করছে ছাত্র অবস্থায় পার্ট টাইম চাকুরি নাকি টিউশনি করা উচিত। আপনি যেটা পছন্দ করেন ঠিক সেভাবেই আপনার কাজ খুঁজে নিবেন। আমাদের কাজ হল আপনার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর করা। আশা করি, এই আর্টিকেল পড়লে আপনাদের সমস্যা কিছুটা হলেও সমাধান হবে। কারণ আজকাল অনেক বিকল্প ব্যবস্থা আছে। তাই আত্মবিশ্বাসী হোন নিজের ব্যাপারে, আত্মবিনাশী নয়। আপনি যে কাজই করেন না কেন অবশ্যই তার মূল্য আপনি পাবেন। কাজের ক্ষেত্রে ছোট বড় বলে কিছু নেই। তাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে কাজ করুন। শিক্ষার্থীদের জন্য রইল  শুভকামনা।