বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বিশ্ব এমনিতেই ভার্চুয়াল কাজের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তাই কম্পিউটার বিষয়ে মৌলিক জ্ঞান থাকাটা এখন সকলের জন্য আবশ্যক হয়ে পড়েছে। অফিসের বেশিরভাগ কাজই এখন কম্পিউটার নির্ভর। তাই এই ডিজিটাল দুনিয়ায় কম্পিউটারের বেসিক জ্ঞান না থাকলে চাকরি পেলেও টিকে থাকবে তা বলা মুশকিল। সব ধরনের চাকরির ক্ষেত্রেই এই কথাটি প্রযোজ্য। বর্তমানে এমন কোন চাকুরীর বিজ্ঞপ্তি দেখা যায় না যেখানে কম্পিউটারের মৌলিক অভিজ্ঞতা চাওয়া হয় না। ফলে যাদের কম্পিউটার সম্পর্কে সাধারণ এসব দক্ষতা নেই তারা অনেক সময় চাকুরীতে আবেদনই করতে পারে না। তাই এই বিষয়টিকে এখন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন সব চাকুরীপ্রার্থীদের। আজকাল সরকার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে কম্পিউটার জ্ঞানকে বাধ্যতামূলক করেছে তাই এসব পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এখন অনেকাংশে এগিয়ে আছে কম্পিউটারের মৌলিক জ্ঞান সম্পর্কে। তাই যারা পিছিয়ে আছেন এখনো কম্পিউটারের মৌলিক স্কিলগুলো থেকে তাদের জন্য আজকের আর্টিকেল। আশা করি, পিছিয়ে পড়া চাকুরীপ্রার্থী এবং শিক্ষার্থীদের অনেক উপকারে আসবে আজকের ১০টি দরকারি কম্পিউটার স্কিল শিখে রাখুন আর্টিকেলটি। চলুন তাহলে দেখে নেয়া যাক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো।

১০টি দরকারি কম্পিউটার স্কিল এর মধ্যে প্রথমেই যে বিষয়টি সবার আগে মাথায় আসে তা হল বেসিক অপারেটিং সিস্টেম। এরমধ্যে কম্পিউটার কিভাবে চালু ও বন্ধ করতে হয়, এমএস ওয়ার্ড, এমএস এক্সেল, পাওয়ারপয়েন্ট, ফাইল কিভাবে কপি করা যায় ইত্যাদি বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য। তাহলে চলুন অপারেটিং সিস্টেমের মধ্যে কি বিষয় গুলো আমাদের জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেখে নেয়া যাক।

বেসিক অপারেটিং সিস্টেমঃ

বেসিক অপারেটিং সিস্টেম সম্পর্কে ধারণা রাখা প্রত্যেকটি শিক্ষার্থীর এবং সেই সাথে চাকুরী প্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অপারেটিং সিস্টেমের ক্ষেত্রে যে বিষয় প্রথমে আসে তা হল কিভাবে কম্পিউটার বা ল্যাপটপ বন্ধ কিংবা চালু করতে হয়্‌, কিভাবে একটি ফোল্ডার তৈরি করা যায় সেই সাথে ফোল্ডারে কিভাবে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কপি বা পেস্ট করতে হয়। কিভাবে ডেক্সটপ ব্যাকগ্রাউন্ড পরিবর্তন করা যায়, কিভাবে একটি প্রোগ্রাম এর শর্টকাট তৈরি করা যায়। এগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিচে দেওয়া হল।

ওয়ার্ড প্রসেসিং এবং স্প্রেডশিট এর কাজ – কম্পিউটারে ওয়ার্ড প্রসেসিং এর কাজ হল লেখালেখির কাজ। মাইক্রোসফট অফিস ওয়ার্ড হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম। তাছাড়া স্প্রেডশিট এর কাজ জানা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো না জানলে চাকুরী ক্ষেত্রে বা নিজের ব্যক্তিগত কাজ করা অনেক ঝামেলাপূর্ণ হয়ে যায়। স্প্রেডশিট হল মাইক্রোসফট এক্সেল, এতে বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ করা যায়। অফিস আদালতে এগুলোতেই বিভিন্ন কাজ করা হয়ে থাকে।

মাইক্রোসফট পাওয়ার পয়েন্ট – মাইক্রোসফট অফিসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মাইক্রোসফট পাওয়ার পয়েন্ট। এটি মূলত বিজ্ঞাপনের কাজে বেশি ব্যবহৃত হয়। একে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন ও বলা হয়ে থাকে। প্রেসেন্টেশন এর অর্থ হলো উপস্থাপন করা। যেমন বিভিন্ন সেমিনারে আলোচনা, বিভিন্ন প্রদর্শনী, কনফারেন্সে এই জায়গায় কোন বিষয়ের উপর বক্তা তার মতামত দর্শকদের কাছে উপস্থাপন করেন। পাওয়ার পয়েন্ট দিয়ে এই উপস্থাপনের কাজগুলো খুব সহজে করা যায়। এম এস পাওয়ার পয়েন্ট দিয়ে আরও অনেক কাজ করা যায় যেমন

  • প্রেজেন্টেশন তৈরি করা যায়।
  • এটি দিয়ে বিষয়গুলি আলাদা আলাদা আলাদা স্লাইডে লেখা যায়।
  • স্লাইডে প্রয়োজন অনুসারে ডিজাইন দেওয়া যায়।
  • স্লাইড গুলোকে একত্রে ফাইলে রাখা যায় এবং প্রিন্ট করা যায়।
  • প্রজেক্টর এর সাহায্যে স্লাইড শো করে কোন বিষয় উপস্থাপন করা যায়।

ইমেইল – এখন যোগাযোগের জন্য চিঠিপত্রের বদলে জায়গা করে নিয়েছে ইমেইল। অফিস থেকে শুরু করে যে কারো সঙ্গে যোগাযোগের জন্য স্মার্ট পদ্ধতি হলো ইমেইল। এর মাধমে খুব দ্রুত পৌঁছে যায় আপনার বার্তা আপনার কাঙ্খিত লক্ষ্যে। এছাড়া অফিসের নোটিশ ও এখন ইমেইলের মাধ্যমে সার্কুলেট করা হয়ে থাকে। ইয়াহু মেইল জিমেইলের মত ফ্রী সেবাতে তাই একাউন্ট থাকা উচিত। তাই ইমেইল ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞান থাকা আবশ্যক।

বেসিক কম্পিউটার হার্ডওয়্যারঃ

একটি কম্পিউটারে অনেকগুলো পার্টস থাকে মানে যন্ত্রাংশ থাকে। এই যন্ত্রাংশগুলো বিভিন্ন সফটওয়্যার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এগুলোর প্রত্যেকটিকে হার্ডওয়্যার বলে। একটি কম্পিউটার কেনার পর এর যন্ত্রাংশ সম্পর্কে ধারণা রাখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এগুলো কিভাবে ব্যবহার করতে হয় সেগুলো জানা অনেক জরুরী। র‍্যাম, হার্ডডিক্স, বিভিন্ন ডিভাইস, মাদারবোর্ড পাশাপাশি কিভাবে মনিটর, সিপিইউ, মাউস কিবোর্ড কিংবা সিপিইউ তে এগুলো ডিভাইস কিভাবে কানেকশন দিতে হয় এগুলো সম্পর্কে জ্ঞান থাকা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও পিসি কিভাবে পরিষ্কার রাখতে হয় এবং ভাইরাস মুক্ত রাখা যায় সেটাও জানা প্রয়োজন।

ইন্টারনেট ব্রাউজিংঃ

বর্তমানে ইন্টারনেট এবং কম্পিউটার ছাড়া জীবনেই অচল বলা চলে। কম্পিউটারে কিভাবে ইন্টারনেট ব্রাউজ করতে হয় সেটা জানাও জরুরি বিষয়। যে কোন সেবা বা চাকুরী সবকিছুই এখন ইন্টারনেটের উপর নির্ভরশীল। এগুলো না জানলে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বড় বাঁধা আসে। বর্তমান সময়ে তাই ইন্টারনেট ব্রাউজিং সম্পর্কে ক্লিয়ার ধারণা রাখা প্রয়োজন।

টাইপিং দক্ষতাঃ

একজন চাকুরীপ্রার্থীর জন্য টাইপিং জানা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। টাইপ করার সাধারণ নিয়ম হচ্ছে ইংরেজিতে প্রতি মিনিটে ৪০টি শব্দ এবং বাংলায় ২৫টি শব্দ টাইপ করতে পারা। বর্তমানে টাইপিং প্রাকটিস করার জন্য অনেক সফটওয়্যার আছে। যেগুলোর কোনো একটিতে প্রাক্টিস করলে টাইপিং এর দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব হয়। আমাদের প্রায়ই বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট এর জন্য টাইপ করার দরকার হয়। টাইপিং এ দক্ষতা থাকলে নিজের কাজগুলো করা অনেক সহজ এবং সাশ্রয় হয়। তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে টাইপিং ছাড়া কোন চাকুরী বা ব্যবসায় ভালো করা সম্ভব হয় না। কেননা যোগাযোগ রক্ষায় ইমেইল লেখা থেকে শুরু করে অন্যান্য সব কাজেই টাইপিং এর প্রয়োজন হয়। তাই এটা জানা থাকলে অনেক এগিয়ে থাকা সম্ভব হয়।

কীবোর্ড শর্টকার্টঃ

কম্পিউটারে মাউস ছাড়া কপি/ পেস্ট করা যায় কিছু শর্টকার্ট দিয়ে। এই কিছু কমন কীবোর্ড শর্টকার্ট জানা থাকলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়, এতে সময়ও অনেক বাঁচে।

কম্পিউটার দক্ষতা – সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং স্কিলঃ

সোশ্যাল সাইটগুলোতে নানা ধরনের ও পেশার মানুষ রয়েছে। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর মাধ্যমে এসব মানুষের সাথে পরিচয় হওয়া সম্ভব হয়। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং স্কিল বলতে কিভাবে কথা বলা যায়, নেগেটিভিটি কিভাবে এড়িয়ে চলা যায়, কি রকম আচরণ করা প্রয়োজন ইত্যাদি বুঝায়। এই স্কিলটি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলো পড়াশোনা থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ফেইসবুক,টুইটা্‌র, পিন্টারেস্ট লিঙ্কডিন এগুলোত অ্যাকাউন্ট তৈরি করে এগুলোর মাধ্যমে কিভাবে কাজ করা যায় সেগুলো জানা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাই এগুলোর ব্যবহার সম্পর্কে ধারণ থাকতে হবে। তবেই চাকুরী ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা সম্ভব হবে।

কম্পিউটার দক্ষতা – গ্রাফিক্স ডিজাইনিংঃ

কম্পিউটারে দক্ষতার ক্ষেত্রে গ্রাফিক্স ডিজাইন বেশ গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি দিয়ে ম্যাগাজিন, পোস্টার, ব্যানার আরো অনেক কিছু তৈরি করা যায় এমনকি অ্যানিমেশন তৈরি করতেও গ্রাফিক্স ডিজাইনের প্রয়োজন হয়। কম্পিউটারে এডোবি ফটোশপ এবং এডোবি ইলাস্ট্রেটর এর ব্যবহার জানা থাকলে অনেক বিষয়ে অনেকেই থেকে এগিয়ে থাকা সম্ভব হয়। তাই বলা যায় গ্রাফিক্স স্কিল জানা বর্তমানে একটি উচ্চমানের দক্ষতা।

কম্পিউটার দক্ষতা – সফটওয়্যার ইনস্টল এবং আনইন্সটল করাঃ

কম্পিউটারে এমএসঅফিস, এডোবি ফটোশপ, টাইপিং টিউট্‌র, বেসিক অ্যাপ্লিকেশন গুলো কিভাবে ইন্সটল করতে হবে তা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিজের কম্পিউটারে সফটওয়্যার ইন্সটল করার জন্য বারবার অন্যের সাহায্য চাওয়ার দরকার পরে না। তাই প্রত্যেকের উচিত সফটওয়্যার কিভাবে ইন্সটল এবং আনইন্সটল করতে হবে তার ধারণা থাকা। এর উপকারিতা গুলো হল
এগুলো জানা থাকলে আপনি নিজেই এসব কাজ করতে পারবেন এতে আপনার টাকা সাশ্রয় হবে।
এগুলো জানা থাকলে আপনি ইনস্টলেশন সেবা দিতে পারবেন। এতে অর্থ উপার্জনও সম্ভব।
সফটওয়্যার ইনস্টল এবং আনইনস্টল কিভাবে করতে হয় এ সম্পর্কে ব্লগ তৈরী করতে পারবেন।
এগুলো জানা থাকলে এমন অফিসে কাজ করতে পারবেন যেখানে প্রত্যেকদিনই কম্পিউটার রক্ষণাবেক্ষণ করার প্রয়োজন পড়ে।

ব্লগিং এবং কনটেন্ট রাইটিং স্কিলঃ

ব্লগিং এবং কনটেন্ট রাইটিংয়ের দক্ষতা হল এখনকার সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি দক্ষতা। ইন্টারনেটের মার্কেটিং বিষয়টি কনটেন্টের উপর নির্ভরশীল। তাই নিজের একটি ব্লগ ওয়েবসাইট খুলে নিয়ে এতে বিজ্ঞাপন রেখে অর্থ উপার্জন করা যায়। এমনকি এভাবে আপনি অন্যের ব্যবসা সামগ্রির জন্য লিখেও অর্থ উপার্জন করতে পারেন। সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এর জন্য কনটেন্ট লিখে উপার্জন করা এখন অনেক জনপ্রিয় একটি কাজ।

ইন্টারনেট রিসার্চঃ

যে সব দরকারি কম্পিউটার স্কিল এর কথা বলা হলো সেগুলোর মধ্যে ইন্টারনেটে রিসার্চ করা যায় কিভাবে এই স্কিলটিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। রিসার্চ অর্থ হলো অনুসন্ধান করা।যখন বিভিন্ন ওয়েব ব্রাউজে সার্চ দিয়ে কোনো বিষয় সম্পর্কে জানা যায় সেগুলোকে রিসার্চ বলে। যখন কেউ কোনো সমস্যার সমাধান খোঁজে রিসার্চ তখনই করার প্রয়োজন পরে। কোন প্রজেক্ট তৈরি করার জন্য রিসার্চ করার দরকার হয়। ডিজিটাল মার্কেটিং এর জন্যও রিসার্চ করার দরকার হয়। তাই এসব বিষয় সম্পর্কে ধারণা রাখা অনেক প্রয়োজন।

সিভি লেখার নিয়ম চাকুরির ইন্টারভিউ এ ডাক পাওয়ার জন্যে

এই স্কিলগুলো শিখে রাখলে আশা করা যায় শিক্ষার্থী এবং চাকুরিপ্রার্থীরা অনেকের থেকে সবক্ষেত্রেই বেশি এগিয়ে থাকবে। এসব বিষয়ে ইন্টারনেট থেকেও জানা থেকে আবার কেউ চাইলে কোর্স ও করতে পারে। শুধু চাকুরীর আবেদন করা নয়, যারা বর্তমানে চাকুরীরত আছেন তাদেরও কম্পিউটারের দরকারি স্কিল গুলো জেনে রাখা প্রয়োজন। তাহলে অফিসের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। আর যারা এসব বিষয়ে দক্ষ তাদের ক্যারিয়ারের জন্য এ বিষয়গুলো অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। যে কোন অফিসের কাজ করতে হলে খুব বেশি কিছু জানার প্রয়োজন হয় না, এই বেসিক জিনিসগুলোই কাজে লাগে। যারা চাকুরিপ্রার্থী আছেন এগুলোই প্রাথমিকভাবে আপনাকে অনেকটাই যোগ্য করে তুলবে চাকুরীর জন্য। আপনার জানার এবং শেখার আগ্রহ আপনাকে সফলতার উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেবে এটাই আমাদের লক্ষ্য। পরিশেষে সবার জন্য রইল শুভকামনা।

আপনি চাইলে আমদের ফেসবুকে লাইক দিয়ে সাথে থাকতে পারেন। https://www.facebook.com/Bekarcombd